আত্মার অদ্ভুত শূন্যতা

ইমরারন আলী টিপু:
শীতল ভোরের আলো। কুয়াশায় ঢাকা গ্রামের ছোট্ট এক ঘর। ঘরের কোণে বসে আছেন একজন মানুষ—নাম তাঁর আশিক। বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। জীবনের সব দিক দিয়ে তিনি অনেক কিছু অর্জন করেছেন—চাকরি, টাকা, ঘরবাড়ি, সন্তান। কিন্তু অন্তরের গভীরে এক অদ্ভুত শূন্যতা তাঁকে প্রতিদিন পুড়িয়ে খাচ্ছে। রাতের শেষ প্রহরে তাঁর অভ্যেস—মসজিদের সামনে বসে একা একা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা। আজও তাই। হিমেল হাওয়ায় তাঁর হৃদয় যেন ফেটে যাচ্ছে। হঠাৎ চোখে জল এসে যায়। তিনি মনের মধ্যে ফিসফিস করে বলেন—হে আল্লাহ! তোমাকে ছাড়া আমার জীবনের আর কোন মানে নেই।শপথ করে বলছি, আমি আমার আত্মাকে তোমার প্রেমে উৎসর্গ করবো।”সেই দিন থেকেই তাঁর জীবনে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। যাত্রার শুরু আশিক সাহেব আগে কখনো ধর্মীয় কাজে সক্রিয় ছিলেন না। নামাজ হতো মাঝে মাঝে, রোজা থাকত মাঝে মধ্যে, কুরআন পড়া হতো শুধুই রমজানে। কিন্তু সেদিনের সেই শপথ তাঁর ভেতরের মানুষটিকে বদলে দেয়। তিনি প্রতিদিন ফজরের নামাজের আগে উঠতে শুরু করেন। অযু করে মসজিদে গিয়ে প্রথম সারিতে দাঁড়ান। নামাজ শেষে বসে যান ধ্যানের মতো করে। সেই সময়টা যেন শুধু আল্লাহ আর তাঁর—মাঝে কোনো দেয়াল নেই, কোনো ভিড় নেই। – ত্যাগ একদিন দুপুরে বাজারে যাচ্ছিলেন আশিকসাহেব। পথে দেখলেন এক বয়স্ক ভিক্ষুক কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে আছে। আগে হয়তো পাশ কাটিয়ে চলে যেতেন। কিন্তু আজ তাঁর হাত নিজে থেকেই পকেটে গেল। যা ছিল সব ভিক্ষুকের হাতে দিলেন। লোকটা চোখে জল নিয়ে তাকালেন—“আপনি কে?” আশিক সাহেব হেসে বললেন—“আমি কেউ নই। আমি শুধু আল্লাহর প্রেমে থাকা একজন মানুষ।” সেদিন তিনি বুঝলেন, আল্লাহর প্রেম শুধু নামাজ-রোজায় নয়; মানুষের পাশে দাঁড়াতেও শেখায়। নিজের স্বার্থ, লোভ, অহংকার—সব ছেড়ে দিতে শেখায়। আত্মার মুক্তি দিন যায়, মাস যায়। আশিক পরিবার প্রথমে অবাক হয়। স্ত্রী প্রশ্ন করেন—“তুমি এত বদলে গেলে কেন?” আশিক ধীরে ধীরে বলেন—“আমাদের জীবন ক্ষণিকের। একদিন সব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আত্মার যে তৃষ্ণা, তা মেটে শুধু আল্লাহর প্রেমে।” তিনি এখন গ্রামের তরুণদের একত্রিত করে কুরআন পড়ান, অসহায়দের সাহায্য করেন, নিজের আয় থেকে বড় অংশ দান করেন। আর প্রতি রাতে তাঁর কণ্ঠে শোনা যায়—হে আল্লাহ! তোমার প্রেমই আমার প্রাণ, তোমার ইবাদতেই আমার শান্তি। আমার আত্মা তোমার অর্ঘ্য।” শেষ অধ্যায় – আধ্যাত্মিক উপলব্ধি একদিন ভোরে তাঁর ছেলে মসজিদে এসে দেখে, আশিক সেজদায়। তাঁর মুখে শান্তির ছাপ। মনে হয় যেন ঘুমিয়ে আছেন। কিন্তু না—তিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। লোকজন আসে, মসজিদ ভরে যায় কান্নায়। সবাই বলে—“এই মানুষটা ছিলেন আল্লাহর প্রেমে মগ্ন। তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সত্যের পথে।” সেদিন গ্রামের মসজিদে ইমাম খুতবা দেন “যে আল্লাহর প্রেমে আত্মাকে উৎসর্গ করে, তার জন্য দুনিয়া আর আখিরাত দুটোই সুন্দর হয়। শপথ করে বলছি, তা ব্যতীত অন্য কোনো পথ নেই। উপসংহার আশিক সাহেব জীবন একটি শিক্ষা রেখে যায়— আল্লাহর প্রেম মানে শুধু উপাসনা নয়; দান, ত্যাগ, ক্ষমা, ভালোবাসা, আর নিঃস্বার্থ সেবা। আত্মাকে সেই প্রেমে উৎসর্গ করলে মানুষের জীবন বদলে যায়। একদিন সে শান্তির আলোয় মিলিয়ে যায়, আর তার নাম বেঁচে থাকে দোয়ায়, স্মৃতিতে, ভালোবাসায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ