সকালের সুর আর মায়ের মুখ

(ইমরান আলী টিপু) নিউইয়র্কের ঠান্ডা শহর। সকালবেলা জানালার ওপাশে ধূসর আকাশ, বরফে ঢাকা রাস্তা। ব্যস্ত মানুষগুলোর গাড়ির হর্ণের শব্দে ভরে আছে চারপাশ, কিন্তু আলীর ঘরটা যেন নীরবতার দেয়ালে বন্দী। বিছানা থেকে উঠে সে চুপচাপ জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। কাচে জমে থাকা বরফ মুছে বাইরে তাকাল, আর বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল। এই সকালগুলো ওর কাছে কোনোদিনও “সকাল” বলে মনে হয় না। কারণ দেশে থাকাকালীন সকালে সে ঘুম ভাঙত এক পরিচিত, এক পবিত্র সুরে মায়ের মুখে কোরআন তেলাওয়াতের সুর। ফজরের নামাজের পর মা বসে বসে কোরআন পড়তেন। সেই তেলাওয়াতের সুরেই যেন পুরো ঘরটা ভরে থাকত শান্তিতে। জানালার ফাঁক দিয়ে সকালের আলো আসত, আর মা সেই আলোয় বসে থাকতেন—চোখে প্রশান্তির ছায়া, ঠোঁটে আল্লাহর কালাম। আলীর সেই সুরে ঘুম ভাঙাতো, মায়ের হাতের গরম চা খেত, তারপর হালকা গলায় মা বলতেন— “উঠে যা বাবা, পড়তে হবে তো। আজ এই প্রবাসের দেশে কেউ তাকে ডাকে না। কেউ কোরআনের সুরে ঘর ভরিয়ে তোলে না। শুধু একটা নিঃশব্দ সকাল আর একটা শূন্য ঘর। মা বলতেন, “তোমাদের সুখ আমি সব সময় কামনা করি বাবা, আল্লাহ তোকে সুখী করবে। আমার জন্য কোন চিন্তা করবে না,তুই দূরে গেলেও, মা তোকে দোয়া দিয়ে যাবে। আলী পড়াশোনা শেষ করে আমেরিকায় পাড়ি জমাল। বুকভরা স্বপ্ন—একদিন মাকে নিজের কাছে নিয়ে আসবে। মাকে আর কোনো কষ্ট পেতে দেবে না। মাকে নিয়ে যাবে হাসপাতাল, ভালো চিকিৎসা করাবে, সুন্দর একটা রুমে রাখবে। সকালবেলা ঘুম ভাঙবে মায়ের সেই সুরে, তবে এবার আমেরিকায়। প্রতিদিন রাতে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলত সে। মা, তোমাকে আমি নিয়ে আসব আমার কাছে। তুই ভালো থাকিস বাবা, আমার সুখ তোর সুখে। সবকিছু রেডি হয়ে গিয়েছিল। ভিসা প্রসেসিং, —সব ঠিকঠাক। কিন্তু জীবন সবসময় স্বপ্নের মতো হয় না। একদিন হঠাৎ ফোন এলো দেশে থেকে— “আলীর… তোর মা অসুস্থ। আলী ভেবেছিল, হয়তো ছোট কিছু। কিন্তু পরের ফোনেই সে শুনল সেই কথা—যা কোনো সন্তান শুনতে চায় না। বড় ভাই ফন করলো মা নাই রে সেই মুহূর্তে চারপাশের সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। মায়ের কোরআন তেলাওয়াতের সেই সুর, সেই মুখ, সেই ডাক—সবকিছু যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল। বুকের ভেতর একটা শূন্যতা তৈরি হলো, এমন এক শূন্যতা যা কোনো শব্দে বোঝানো যায় না। আলী দেশে ফিরতে পারল না। মায়ের কবরের পাশে দাঁড়াতে পারল না। কপালে চুমু খেতে পারল না। শেষবারের মতো বলতে পারল না — “মা… আমি তোকে অনেক ভালোবাসি।” সেই দিন থেকে প্রতিটি সকাল তার কাছে এক যন্ত্রণার সকাল। ঘুম ভাঙে না কোনো সুরে, ভাঙে অদ্ভুত নিঃশব্দতায়। সে জানালার ধারে বসে থাকে, আর মায়ের মুখটা মনে পড়ে। মনে পড়ে কোরআন তেলাওয়াতের সেই সুর, যেটা এখন শুধু স্মৃতি। মায়ের জায়গা কেউ নেয় না। কেউ নিতে পারে না। বন্ধু, আত্মীয়, টাকা—কিছুই সেই শূন্যতা ভরাট করতে পারে না। কারণ মা-ই সন্তানের জীবনের আসল সুখের ঠিকানা। আলী আজ বুঝেছে প্রবাসের সব ঝলকানি, ডলারের পাহাড়, বিলাসী জীবন সবকিছু অর্থহীন যদি পাশে না থাকে মায়ের ছায়া। মায়ের ডাকে যে উষ্ণতা, যে শান্তি—তা এই পৃথিবীর আর কোথাও নেই। মায়ের কোরআন তেলাওয়াতের সেই সকাল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সকাল ছিল। আজ সবকিছু আছে, কিন্তু সেই সুরটা নেই। সেই মুখটা নেই। সেই শান্তিটা নেই। রাতের শেষে মায়ের ছবির সামনে বসে সে আস্তে আস্তে বলে মা, আমি তোমার কাছে আসতে পারিনি… তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। তুমি আমার সব ছিলি, মা। তুমি আমার পৃথিবী। ছবির ভেতর মায়ের হাসি যেন বলছে— “বাবা, আমি তোকে ছেড়ে যাইনি। আমি তোর প্রতিটা নিঃশ্বাসে আছি।” শেষকথা: মা শুধু একজন মানুষ না, মা হলো সন্তানের জীবনের প্রথম আলো, শেষ আশ্রয়। মা চলে গেলে ঘর থাকে, দেয়াল থাকে, শহর থাকে—কিন্তু সেই আলোটা নিভে যায়। বিদেশে এসে আমরা হয়তো অনেক কিছু অর্জন করি, কিন্তু হারিয়ে ফেলি আসল সুখের ঠিকানা — মা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ